পরিচালনার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে চট্টগ্রাম বন্দর। তবে দুর্বল ব্যবস্থাপনার পরেও এই বন্দরের দক্ষতা একেবারে খারাপ নয়। এমন তথ্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার জন্য দায়ী করা হয়েছে শতভাগ সরকারি ব্যবস্থাপনাকে। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো বন্দর সম্পূর্ণভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে না বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামই দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র বন্দর যেটি ‘টুল পোর্ট’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। টুল পোর্ট হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে বন্দর পরিচালনার সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিশ্বের সব উন্নত বন্দর এখন ‘ল্যান্ডলর্ড’ মডেলে পরিচালিত হয়। ল্যান্ডলর্ড মডেলে একটি বন্দরের পরিচালনার বেশির ভাগ কাজ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে করা হয়, সরকার শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা পালন করে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর পর্ষদের সদস্য জাফর আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প না থাকায় এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বা ল্যান্ডলর্ড মডেলে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তবে নতুন যেসব টার্মিনাল হচ্ছে সেগুলো ল্যান্ডলর্ড মডেলে পরিচালনার পরিকল্পনা আছে বন্দরের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মোট রপ্তানির ৭৫ শতাংশই সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। রপ্তানির জন্য এতটা নির্ভরশীল হওয়ার পরও শ্রীলঙ্কা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশেরই সমুদ্রবন্দরের অবকাঠামো ও পরিচালনগত দক্ষতা তেমন উন্নত নয়। বন্দরের অদক্ষতার কারণে আর্থিক ক্ষতির একটি চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের বন্দরগুলো শ্রীলঙ্কার মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পণ্য রপ্তানির খরচ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ কম হতো। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই তিনটি দেশের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ ছিল দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত।
প্রতিবেদন মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে সবচেয়ে কম গভীরতার জাহাজ আসতে পারে। ফলে চট্টগ্রামে বড় আকারের জাহাজ ভিড়তে পারে না, এতে পণ্য রপ্তানির খরচ বাড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ মিটার গভীরতার ও শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে ১৮ মিটার গভীরতার জাহাজ আসতে পারে। একইভাবে পাকিস্তানের করাচি ও ভারতের জওহরলাল নেহরু বন্দরের ১৬ থেকে ১৮ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারে।
কনটেইনার পরিবহনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ আসার পর পণ্য খালাস থেকে শুরু করে সব কাজ শেষ করতে তিন দিনের বেশি সময় লাগে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকার সমালোচনা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনার পরিবহনে শুধু একটি বিশেষায়িত টার্মিনালের সম্পূর্ণ নির্মাণ শেষ করতে পেরেছে। ২০০৭ সালে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল তৈরি করা হলেও সেখানে কনটেইনার পরিবহনে আধুনিক ক্রেন নেই। বন্দরের অর্ধেকের বেশি কনটেইনার এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে পরিবহন করা হয়।
বন্দর পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলির বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহনে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তাদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করা হয়। বন্দর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বাড়াতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর অতি নির্ভরশীলতা কমাতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুপারিশও করেছে বিশ্বব্যাংক।

No comments:
Post a Comment