Latest News

Featured
Featured

Gallery

Technology

Video

Games

Recent Posts

Sunday, December 10, 2017

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম বেহাল- জলাবদ্ধতার পর এবার ভাঙা রাস্তা by সুজন ঘোষ

বর্ষা এলেই দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সড়ক বেহাল হয়ে পড়বে—এটি এখন নিয়তি। সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নে সিটি করপোরেশন প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা খরচ করে। এরপরও ভাঙা সড়কের ভোগান্তি থেকে মুক্তি নেই। টানা বৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতার কারণে গত দুই মাসে চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৩০০ কিলোমিটার সড়ক ভেঙেছে। সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, চার বছরের মধ্যে এবারই সড়কের (কিলোমিটারের হিসাবে) সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।

দুই মাস ধরে বৃষ্টি আর জোয়ারের জলাবদ্ধতায় ভুগছে চট্টগ্রাম। গত এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা না থাকলেও ভাঙা সড়ক ভোগাচ্ছে বাণিজ্যিক রাজধানীর মানুষকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য নগরের বিধ্বস্ত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বড় বাধা বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা মনে করেন, চট্টগ্রামে ব্যবসার ক্ষতি হলে সারা দেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নে প্রতি বছর শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও তার সুফল জনগণ পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি বছরই সড়ক ভাঙছে। এতে বুঝা যায় সড়ক ও উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা সম্পূর্ণ অপচয় হচ্ছে। সুশাসনের অভাবের কারণেই এই সমস্যা হচ্ছে। সুশাসনের অভাবে ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে না। তখন কাজের গুণগত মানও খারাপ হয়। কোনো ধরনের  জবাবদিহি না থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ইচ্ছেমতো টাকা খরচ করছেন। কিন্তু তার সুফল নেই।

চলতি বছরের ৩১ মে, ১২ জুন এবং ৩, ৪, ২৩, ২৪ এবং ২৫ জুলাই ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নগরের বিভিন্ন এলাকার সড়ক ডুবে যায়। ওই সাত দিনের জলাবদ্ধতায় নগরের মোট সড়কের প্রায় ৩০ শতাংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নগরে সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ৬৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রধান সড়ক ৩০০ কিলোমিটার। বাকিগুলো অলিগলির সড়ক।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, নগরের মূল সড়কই নষ্ট হয়েছে প্রায় দেড় শ কিলোমিটার। বাকি দেড় শ কিলোমিটার বিভিন্ন অলিগলির সড়ক। ক্ষতিগ্রস্ত ৩০০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে গত ৩ জুলাই চিঠি দেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

২০১৪ সালে বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম নগরের ১০০ কিলোমিটার সড়ক ভেঙে যায়। পরের বছর ১৫০ কিলোমিটার এবং ২০১৬ সালে ১১০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই তথ্য সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের।

সিটি করপোরেশনের বাজেট ও বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত চারটি অর্থ বছরে সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় হয় ৫০১ কোটি টাকা। এই সময়ে সড়ক মেরামত করা হয় ৩৭৭ কিলোমিটার। গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নে (পুরোনো রাস্তা নতুন করে নির্মাণ) ব্যয় হয় ১৯০ কোটি ৭২ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে সড়কের সংস্কার ও উন্নয়নে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রতিবছরই এই খাতে ব্যয় বাড়ছে।

কর্ণফুলী নদীর পারে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মেরিনার্স সড়ক ২০১৪ সালের ২৩ জুলাই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তিন বছর পার হওয়ার আগেই এই সড়কটি খানাখন্দে ভরে গেছে। একই অবস্থা ২০১৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধন হওয়া মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কেরও। উদ্বোধনের পরের বছরেই বৃষ্টিতে সড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় গর্ত হয়। ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এই সড়কের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে।

নির্মাণের দুই-তিন বছরের মধ্যে সড়ক কেন ভেঙে যাচ্ছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, চট্টগ্রামে পরিকল্পিত পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় প্রবল বৃষ্টি ও জোয়ারের সময় বিভিন্ন সড়ক ডুবে যায়। ডুবে থাকা সড়কেই চলে ভারী যানবাহন। সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ মান বজায় রাখা হয় না। এ ছাড়া বিভিন্ন সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি তো রয়েছেই। মূলত এই তিন কারণে চট্টগ্রামের সড়ক টেকে না। সঠিক মান অনুসরণ করে নির্মাণ করা হলে পিচ ঢালাইয়ের সড়ক ১০ বছর টেকসই হওয়ার কথা।

তবে সড়কের সংস্কার কাজের মানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকৌশলগত ত্রুটি নেই বলে মনে করেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এবার অতিবর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় সারা দেশের রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রামও এর বাইরে নয়। এ ছাড়া এখানে উন্নয়ন কাজের জন্য বিভিন্ন সেবা সংস্থা সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করছে। এতে পানি জমে সড়ক আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালের জুন মাসে ৬ দশমিক ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরাকান সড়কের সংস্কার ও উন্নয়নকাজ করেছিল। চার বছর আগে নির্মিত এই সড়কের বেশির ভাগ অংশে পিচের অস্তিত্ব নেই। সড়কের বহদ্দারহাট অংশে উড়ালসড়কের র‍্যাম্প নির্মাণ করছে সিডিএ। আর পানির পাইপ বসানোর জন্য সড়কের এক পাশ খুঁড়েছে ওয়াসা।

এই সড়কের বিষয়ে দুই বাসচালক আবদুল হক ও জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আরাকান সড়কের কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত যেতে আগে সময় লাগত সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা। এখন এই পথ (প্রায় ২২ কিলোমিটার) পাড়ি দিতে সময় লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা। আগে যেখানে ৫-৬টি ট্রিপ (আসা-যাওয়া) দেওয়া যেত, এখন তিন ট্রিপের বেশি দেওয়া যায় না।

গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের সিডিএ অ্যাভিনিউ সড়কের ২ নম্বর গেট মোড়, নাসিরাবাদ সিঅ্যান্ডবি কলোনি ও জিইসি মোড়ের অংশে অসংখ্য খানাখন্দ। ভাঙা রাস্তায় যানবাহন চলাচল করছে ধীরগতিতে। গর্তের কারণে সৃষ্ট ঝাঁকুনিতে ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। জিইসি মোড় থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে পোর্ট কানেকটিং রোডের নিমতলা, পোর্ট কলোনি ও বড়পোল এলাকায় সড়কের অনেক অংশে পিচের অস্তিত্বই নেই।

পোর্ট কলোনির বাসিন্দা হাফেজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ মাস ধরে পিসি রোড নষ্ট। একেবারে ভেঙেচুরে গেছে। ইট দিয়ে একবার ঠিক করলেও তা বেশি দিন থাকে না।

অটোরিকশাচালক শাহ আলম জানান, পুরো শহরের রাস্তাঘাট খারাপ। গাড়ি চালাতে কষ্ট হয়। ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা।

পিসি রোডের নয়াবাজার থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের ছোটপুল এলাকায় সড়কের উত্তর পাশের একাংশ কেটে বৈদ্যুতিক কেব্‌ল লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। সড়কের আরেক পাশের গর্ত ভরাট করা হয়েছে ইট বিছিয়ে। সড়কের শান্তিবাগ এলাকা থেকে ব্যাপারিপাড়া পর্যন্ত অংশেও ছোট-বড় গর্ত রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, ওয়াসা পানির পাইপ বসানোর জন্য নগরের অন্তত বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক, আরাকান সড়ক, হাটহাজারী সড়ক (মুরাদপুর-অক্সিজেন), সিডিএ অ্যাভিনিউসহ ৩৪টি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করছে।

প্রত্যাশিত বরাদ্দ না পাওয়ায় নিজস্ব তহবিলের টাকায় জোড়াতালি দিয়ে নগরের সড়কগুলো সংস্কার করতে হচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নগরের একটি বড় অংশে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। আবার কয়েকটি প্রধান সড়কে সিডিএর উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ চলছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সব সড়ক সংস্কার করা সম্ভব হবে।

শুধু মূল সড়ক নয়, নগরের অলিগলির সড়কগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। গত তিন দিনে সরেজমিনে নগরের জামালখানে আসকারদীঘির পূর্ব পাড় সড়ক, পলিটেকনিক এলাকার আবদুল হান্নান সড়ক, শুলকবহরের আবদুল লতিফ সড়ক, চকবাজারের আবদুল্লাহ খান সড়ক, কাতালগঞ্জের তিন নম্বর সড়ক, উত্তর আগ্রবাদের চৌমুহনী-ব্যাপারিপাড়া সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ জায়গায় ছোট-বড় গর্ত। পিচ ঢালাই উঠে গেছে। অনেক সড়কে হাঁটাও দুষ্কর।

বিভিন্ন সড়কের দুরবস্থার বিষয়ে সিটি বাস সার্ভিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তরুণ দাশগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তায় এত বেশি গর্ত যে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাতে পারছেন না চালকেরা। এতে যানজট হচ্ছে। আবার গর্তে পড়ে গাড়ির স্প্রিং, চাকা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও ব্যয় বেড়েছে। ভাঙা সড়কের কারণে মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও ক্ষতি হচ্ছে।

বর্ষা মৌসুমে বারবার সড়ক ভেঙে যাওয়ায় তিনটি বিকল্প পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে বিটুমিন পদ্ধতিতে (পিচ ঢালাই) সড়ক নির্মাণ করা হয়। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, বিটুমিনের সবচেয়ে বড় শত্রু পানি। পানি জমে থাকলেই সড়ক নষ্ট হয়ে যায়। এর পরিবর্তে টেকসই সড়ক নির্মাণের জন্য রিজিড পেভমেন্ট (কংক্রিটের ঢালাই) বা মডিফাইড বিটুমিনাস কার্পেটিং (বিটুমিনের মধ্যে রাবার বা পলিমারের মিশ্রণ) কিংবা আরসিসি (রোলার-কমপেক্টেড কংক্রিট) পদ্ধতির যেকোনো একটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

এই অধ্যাপক বলেন, সড়ক নির্মাণে বর্তমানে যে টাকা খরচ হয়, এর চেয়ে দেড় গুণ বেশি খরচ পড়বে ওই তিন পদ্ধতির যেকোনো একটিতে। শুরুতে খরচ বেশি হলেও পরে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বর্তমানের চেয়ে অনেক কমবে। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও অদৃশ্য কারণে সিটি করপোরেশন এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করছে না।

সড়ক নির্মাণে তিনটি বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, রিজিড পেভমেন্ট সড়ক নির্মাণের খরচ বিটুমিন সড়কের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। আর প্রধান সড়কগুলো আরসিসিতে করার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। অলিগলির কিছু সড়ক আরসিসিতে করা হচ্ছে। তবে বিদ্যমান পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাজের মান নিয়ে কিছু সমস্যা আছে বলে স্বীকার করেন প্রধান প্রকৌশলী।

ভাঙা রাস্তার কারণে চট্টগ্রাম নগরের যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু রাজধানীতে প্রতিদিন যানজটের কারণে ৩০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। চট্টগ্রামে যানজটের কারণে ক্ষতি ঢাকার চেয়ে বেশি হবে। কেননা সেখানে চট্টগ্রাম বন্দরসহ বেশ কটি শিল্পাঞ্চল রয়েছে। যানজটের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের সামাজিক যোগাযোগ এবং মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিও কম নয়। ফলে চট্টগ্রামের যানজট বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
>>>প্রথম আলো

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর -বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

পরিচালনার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে চট্টগ্রাম বন্দর। তবে দুর্বল ব্যবস্থাপনার পরেও এই বন্দরের দক্ষতা একেবারে খারাপ নয়। এমন তথ্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার জন্য দায়ী করা হয়েছে শতভাগ সরকারি ব্যবস্থাপনাকে। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো বন্দর সম্পূর্ণভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে না বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামই দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র বন্দর যেটি ‘টুল পোর্ট’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। টুল পোর্ট হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে বন্দর পরিচালনার সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিশ্বের সব উন্নত বন্দর এখন ‘ল্যান্ডলর্ড’ মডেলে পরিচালিত হয়। ল্যান্ডলর্ড মডেলে একটি বন্দরের পরিচালনার বেশির ভাগ কাজ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে করা হয়, সরকার শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা পালন করে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর পর্ষদের সদস্য জাফর আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প না থাকায় এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বা ল্যান্ডলর্ড মডেলে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তবে নতুন যেসব টার্মিনাল হচ্ছে সেগুলো ল্যান্ডলর্ড মডেলে পরিচালনার পরিকল্পনা আছে বন্দরের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মোট রপ্তানির ৭৫ শতাংশই সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। রপ্তানির জন্য এতটা নির্ভরশীল হওয়ার পরও শ্রীলঙ্কা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশেরই সমুদ্রবন্দরের অবকাঠামো ও পরিচালনগত দক্ষতা তেমন উন্নত নয়। বন্দরের অদক্ষতার কারণে আর্থিক ক্ষতির একটি চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের বন্দরগুলো শ্রীলঙ্কার মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পণ্য রপ্তানির খরচ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ কম হতো। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই তিনটি দেশের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ ছিল দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত।
প্রতিবেদন মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে সবচেয়ে কম গভীরতার জাহাজ আসতে পারে। ফলে চট্টগ্রামে বড় আকারের জাহাজ ভিড়তে পারে না, এতে পণ্য রপ্তানির খরচ বাড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ মিটার গভীরতার ও শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে ১৮ মিটার গভীরতার জাহাজ আসতে পারে। একইভাবে পাকিস্তানের করাচি ও ভারতের জওহরলাল নেহরু বন্দরের ১৬ থেকে ১৮ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারে।
কনটেইনার পরিবহনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ আসার পর পণ্য খালাস থেকে শুরু করে সব কাজ শেষ করতে তিন দিনের বেশি সময় লাগে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকার সমালোচনা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনার পরিবহনে শুধু একটি বিশেষায়িত টার্মিনালের সম্পূর্ণ নির্মাণ শেষ করতে পেরেছে। ২০০৭ সালে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল তৈরি করা হলেও সেখানে কনটেইনার পরিবহনে আধুনিক ক্রেন নেই। বন্দরের অর্ধেকের বেশি কনটেইনার এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে পরিবহন করা হয়।
বন্দর পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলির বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহনে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তাদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করা হয়। বন্দর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বাড়াতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর অতি নির্ভরশীলতা কমাতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুপারিশও করেছে বিশ্বব্যাংক।

চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল- চিকিৎসাসেবায় ৩৭ বছর ধরে মানুষের পাশে

সময়টা ১৯৮০ সাল। ছোট্ট একটি কক্ষে চালু হয় বর্হিবিভাগ। চিকিৎসক ছিলেন একজন। পাঁচ বছরের মাথায় ১০ শয্যার অন্তবিভাগে রোগী ভর্তি শুরু। দিন দিন বেড়েছে এই হাসপাতালের কলেবর। বর্তমানে ১৪টি অন্তবিভাগ ও ২৫টি বর্হিবিভাগের মাধ্যমে চলছে চিকিৎসাসেবা। শয্যা সাড়ে ৬০০। এ গল্প চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের।

নগরের আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠ সংলগ্ন এলাকায় হাসপাতালটির অবস্থান। বেসরকারি এই সেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে ভোটে নির্বাচিত হয় কমিটি। হাসপাতাল পরিচালনার ব্যয় অনেকটা অনুদান নির্ভর। কম মূল্যের চিকিৎসা ও ভালো সেবার জন্য সব মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে এটি।

হাসপাতালটি শিশু চিকিৎসার জন্য সুনাম কুড়িয়ে আসছে শুরু থেকে। এখন ৬০০ শয্যার মধ্যে ২৫০টিই বরাদ্দ শিশুদের জন্য। নবজাতকদের জন্য রয়েছে আরও ৫০ শয্যা। রয়েছে নবজাতক (১৪ শয্যা) এবং  শিশু (১৬ শয্যা) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রও। এ ছাড়া হাসপাতালে দৈনিক গড়ে প্রসব হয় ২৫টি সন্তান। এর মধ্যে গড়ে অস্ত্রোপচার হয় ১০টি। 

হাসপাতালের পরিচালক মো. নুরুল হক বলেন, এই হাসপাতাল ধাপে ধাপে এই পর্যায়ে এসেছে। ক্রমান্বয়ে নতুন নতুন বিভাগ চালু করা হয়েছে। তবে মান যেন খারাপ না হয় সেদিকে আমাদের লক্ষ্য থাকে। এখন প্রতিদিন গড়ে এক হাজার রোগী হয় বর্হিবিভাগে। আর অন্তবিভাগে গড়ে রোগী থাকে ৫৮০ জন।

গত রোববার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্হিবিভাগে রোগীর ভিড়। অভ্যর্থনা কক্ষের চেয়ারে সেবা প্রার্থীরা অপেক্ষা করছেন। ক্রম অনুসারে নিজের ডাক আসার জন্য অপেক্ষায় সবাই।

অপেক্ষায় থাকা শামীমা আক্তার নামে এক নারী বলেন, আমার শিশুটির কয়েক দিন ধরে জ্বর। তাই বর্হি বিভাগে দেখাতে এসেছি। আমরা এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়ে থাকি। চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো।

মো. ইমন হোসেনের ছেলে আবরারকে (৪) জ্বরসহ গত শনিবার ভর্তি করানো হয়। ইমন হোসেন বলেন, ‘জ্বর বেশি থাকায় এখানে নিয়ে আসি। চিকিৎসকেরা ভর্তি করিয়ে দিতে বলেন। এখন অনেকটা সুস্থ। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমরা সন্তুষ্ট।’

মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন বোনের সঙ্গে এসেছেন বড়ভাই জাহিদ হোসেন। হালিশহরের এই বাসিন্দা বলেন, ‘হাসপাতালটিতে আমরা সবাই চিকিৎসা নিই। আমার ছেলেমেয়ের জন্মও এখানে।’
চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে। ওই বিভাগের চিকিৎসক ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. আবু সৈয়দ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ অনেক উন্নত। অন্ত ও বর্হি বিভাগে শিশু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।’

প্রসূতি বিভাগেও ভিড় ও ব্যস্ততা বেশি। ১৯৯২ সালে এই বিভাগ চালু করা হয়। এ ছাড়া মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগেও বেশি রোগী থাকে। হাসপাতালে দৈনিক গড়ে ৩০টির মতো অস্ত্রোপচার হয়। মোট অস্ত্রোপচার কক্ষ রয়েছে সাতটি। এ ছাড়া রয়েছে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানও।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে,  ১৯৯৭ সালে এখানে ব্লাড ট্রান্সফিউশন (রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ) সেন্টার চালু করা হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালে চালু হয় ইকো কার্ডিওগ্রাফি বিভাগ, বয়স্কদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) ও গ্যাস্ট্রোঅ্যান্টলজি বিভাগ। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় মেডিকেল কলেজ। বর্তমানে হাসপাতালটির সামনে একটি ১৩ তলা ভবন নির্মিত হচ্ছে। ওই ভবনে হাসপাতালটি সম্প্রসারিত হবে। মোট শয্যা দাঁড়াবে সাড় ৮০০। হাসপাতাল ভবনের হবে সাড়ে পাঁচ লাখ বর্গফুটের। বর্তমানে হাসপাতাল রয়েছে দেড় লাখ বর্গফুটের চার তলা ভবনে। হাসপাতাল ও কলেজ ক্যাম্পাসের মোট আয়তন এখন ৪ দশমিক ২৬ একর।

হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. আনজুমান আরা ইসলাম বলেন, একটি ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ করারও পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। এ জন্য অর্থ সংগ্রহও শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্যানসার হাসপাতালের জন্য শূন্য দশমিক ৯৪ একর জমি দিয়েছেন।

তবে হাসপাতালের কার্যক্রম ব্যাঘাতের একমাত্র কারণ জলাবদ্ধতা। গত ২৩, ২৪ ও ২৫ জুলাই হাসপাতালের নিচতলায় প্রায় তিন ফুট পরিমাণ পানি ওঠে।

পরিচালক মো. নুরুল হক বলেন, জলাবদ্ধতার জন্য প্রতি বছর ভুগতে হয়। এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। নতুন ভবনে না যাওয়া পর্যন্ত এই ভোগান্তিতে থাকতে হবে মনে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল- কম খরচে হৃদ্‌রোগের সেবা

বছর পঞ্চাশের সিরাজুল ইসলাম। বাড়ি চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ায়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম বেতনের চাকরি করেন। গত ছয় মাস আগে জানতে পারেন তাঁর হার্টে ব্লক রয়েছে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন ওপেন হার্ট অস্ত্রোপচারের। কিন্তু এত টাকা পাবেন কোথায়? শেষে জানলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে কম খরচে হয় অস্ত্রোপচার। সেখানে ভর্তি হয়ে অস্ত্রোপচার শেষে সিরাজুল সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ আগস্ট।

ওই দিন ছাড়া পাওয়ার আগ মুহূর্তে হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ সার্জারি বিভাগে কথা হয় সিরাজুলের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অস্ত্রোপচারসহ সব মিলিয়ে তাঁর খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার জন্য এখন নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। স্বল্প খরচে হৃদ্‌রোগের সব ধরনের সেবা মেলে সরকারি এই হাসপাতালে। তাই রোগীর চাপও দিন দিন বাড়ছে। তবে জনবল সংকটের কারণে মাঝে মাঝে সেবা গ্রহীতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।

চমেক হাসপাতালে হৃদ্‌রোগ সার্জারি বিভাগ চালু হয়েছে ২০১২ সালে। বিভাগটি চালু হওয়ার পর থেকে এই বিভাগে অন্তত ৩০০ রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই ওপেন হার্ট অস্ত্রোপচার।

বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, এই বিভাগে ওপেন হার্ট অস্ত্রোপচারে খরচ পড়ে ৫০-৬০ হাজার টাকা। স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে করতে গেলে এতে খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। হৃদ্‌রোগের অন্যান্য অস্ত্রোপচার করতে গেলে চমেকে খরচ পড়ে ১০-১২ হাজার টাকা। বাইরে তা তিন থেকে চার গুণ।

কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে সর্বশেষ অস্ত্রোপচারটি হয় সিরাজুল ইসলামের। ওপেন হার্ট সার্জারির পর এখন তিনি সুস্থ রয়েছেন। ওষুধপত্র ও পারফিউশনিস্ট বাবদ তাঁর খরচ পড়েছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা।

কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, ‘নিচের দিকের জনবল আমরা এখনো পায়নি। তাই পুরোদমে কাজ চালাতে হিমশিম খেতে হয়’।

বিভাগ সূত্র জানায়, কম খরচে নিম্ন মধ্যবিত্তদের অস্ত্রোপচার চললেও নানা সংকটে রয়েছে বিভাগটি। ঊর্ধ্বতন চিকিৎসক, নার্স, ক্লিনার, ওয়ার্ডবয় না থাকায় চালু করা যায়নি সার্জারি বিভাগের সাধারণ ওয়ার্ডটি। এ ছাড়া পারফিউশনিস্টের (অস্ত্রোপচারের সময় যিনি হার্ট সচল রাখেন) অভাব তো রয়েছেই। হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় ৮ হাজার বর্গফুট জায়গায় বিভাগটির সীমিতভাবে কাজ চলছে। এ জন্য আরও জায়গা দরকার।

জানতে চাইলে বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক নাজমুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পারফিউশনিস্ট এবং নিম্নস্তরের কর্মচারীর অভাবে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখানকার খরচ সকল বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে অনেক কম। সেবাও ভালো। শুধুমাত্র ওষুধ ও পারফিউনিস্টের জন্য টাকা দরকার হয়।

জানা গেছে, বিভাগটি চালু হওয়ার পর ৯০টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু এখনো ওসব পদ অনুযায়ী নিয়োগ হয়নি। বর্তমানে বিভাগটিতে একজন সহযোগী অধ্যাপক, পাঁচজন সহকারী অধ্যাপক, সাতজন মেডিকেল অফিসার কর্মরত রয়েছেন। ঢাকা থেকে পারফিউশনিস্ট এনে অস্ত্রোপচার করতে হয়।

সরকারি এই হাসপাতালের বাইরে চট্টগ্রামে বেসরকারিভাবে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি এবং ম্যাক্স হাসপাতালে সীমিতসংখ্যক অস্ত্রোপচার হয় বলে চিকিৎসকেরা জানান। এ ছাড়া সম্প্রতি ফরটিস নামে একটি প্রতিষ্ঠান হৃদ্রোগের চিকিৎসাসেবা নিয়ে চট্টগ্রাম এসেছে।

সাধারণ হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার জন্যও চমেক হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের বিকল্প নেই বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। এই বিভাগে সরকারিভাবে শয্যা রয়েছে ৫৬টি। কিন্তু গড়ে এসব বিভাগে রোগী থাকেন দুই শতাধিক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চমেক হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগে রোগীর জন্য পা ফেলা দায়। মেঝেতে বিছানা পেতে রাখা হয়েছে রোগী। বিভাগের বারান্দা,  চিকিৎসক ও সেবিকাদের কক্ষের সামনের মেঝেতেও শয্যা দিয়ে রোগী রাখা হয়েছে।

৫৬টি শয্যার মধ্যে ১৩টি করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) শয্যা, অন্যগুলো সাধারণ। শুধু সাধারণ শয্যায় নয় সিসিইউতেও ১৩ শয্যার বিপরীতে প্রায় ২০ জনের মতো রোগী থাকেন।

জানতে চাইলে হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশীষ দে বলেন, ‘আমাদের এখানে শয্যার তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি রোগী থাকেন। তবু চিকিৎসাসেবার কোনো ঘাটতি নেই। সাধ্যমতো চেষ্টা করে যান চিকিৎসকেরা।’

শুধু অন্তবিভাগ নয়, বহির্বিভাগেও প্রতিদিন গড়ে এক শ রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জনকে অন্তবিভাগে ভর্তির করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এখানকার ক্যাথ ল্যাবে স্বল্প খরচে এনজিওগ্রাম করা হয় বলে জানান হৃদ্‌রোগ বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক রিজোয়ান রেহান। তিনি বলেন, স্বল্প খরচে এখানে এনজিওগ্রাম করা যায়। বেসরকারি হাসপাতালে সেটা বেশি টাকা দিতে হয়।

Monday, February 20, 2017

চট্টগ্রাম কেন চিটাগং? by শান্তনু বিশ্বাস

প্রজাতির উৎপত্তির যেমন বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণ রয়েছে, তেমনি অন্য অনেক কিছুর মতো কোনো দেশের নামকরণের পেছনেও রয়েছে কার্যকারণলব্ধ উৎপত্তির ইতিহাস। ইতিহাসের ক্রমান্বয়িক ধারায় দেখা গেছে শাসক ও শাসনব্যবস্থা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো অঞ্চলের নামেরও পরিবর্তন হয়েছে। সেই বদল হয়েছে শাসকের ইচ্ছানুযায়ী। আবার শাসনের ক্রমবিবর্তনে সে বদলানো নাম মুছে গিয়ে অঞ্চলটি আবার পরিচিত হয়ে উঠেছে তার পুরোনো কিংবা আদি নামে। জন্মানোর পর শিশুকে যে নাম দেওয়া হয়, সে নাম শিশুটির বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার অস্থিমজ্জায় রক্ত-মাংসে, ভাবনায় ও চৈতন্যে এমনভাবে মিশে যায় যে সে নিজেকে তা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। সে নাম তার ভালো কিংবা মন্দ কাজে ব্যাপ্ত বা সংকুচিত হয় বটে, কিন্তু তাতে তার নামের কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
ইংরেজিতে চিটাগং না বলে কেন চট্টগ্রাম লেখা হবে না, তা নিয়ে জল গড়িয়েছে অনেক, কিন্তু লেখার সময় এখন লিখছি চিটাগং। কেন চট্টগ্রাম নয়, তা নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় বোধ হয় এসেছে। ইস্ট বেঙ্গল ডিসট্রিক্ট গেজেটরসের গেজেটর অব চিটাগং ডিসট্রিক্ট বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৩ সালে। মূল্যবান তথ্যসংবলিত সেই বইটিতে বিশদ ও সবিস্তারে চট্টগ্রামের ইতিহাস, এখানকার মানুষ, স্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, সেই সময়কার বেতন-ভাতাদি, বাণিজ্যের নানা খুঁটিনাটি, যাতায়াতব্যবস্থা, জমির রাজস্ব পরিচালনা ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, কৃষিকর্ম ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রন্থটিকে সেই সময়ের চট্টগ্রামকে বিশদভাবে জানার একটি আকর গ্রন্থ বলা যেতে পারে। এই বইটির লেখক ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের দক্ষ কর্মকর্তা এল এস এস ওম্যালি। যাঁদের কাছে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, তাঁরা হলেন স্যার চার্লস অ্যালেন, যিনি ১৯০০ সালে চিটাগং সার্ভে ও সেটেলমেন্ট রিপোর্টটি তৈরি করেছেন এবং সেই সময়কার চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার এইচ লুসন সাহেব।
‘দ্য অরিজিন অব নেইম’ অর্থাৎ এই অঞ্চলের নামের উৎস খুঁজতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমে উদ্ধৃত করেছেন বুদ্ধধর্মাবলম্বীদের ভাষ্য, চৈতকিয়াং কিংবা চৈতাগ্রাম, চৈতার অর্থ হলো বুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, সেই থেকে সম্ভবত এই অঞ্চলের নাম চট্টগ্রাম। হিন্দুমতে চট্টগ্রামের আদি নাম ছিল চট্টলা। মুসলমান শাসক অধিগ্রহণের পরে সে নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো চাটিগাঁও। মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে অর্থাৎ চাটি জ্বালিয়ে পীর বদর শাহ অশুভ প্রেতাত্মাদের তাড়িয়েছিলেন বলে এই নাম। নবম শতকে আরাকানের এক রাজা এই অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী অভিযান চালান। জয় করার পর সেই বিজয়কে চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলের কোন একটি জায়গায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। নির্মাণ শেষে রাজা যে মন্তব্যটি করেন, স্মৃতিস্তম্ভ সেই পরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। মন্তব্যটি হলো, ‘তিসত- তা- গুং’ মানে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া অনুচিত।

একদিন আত্ম-অনুসন্ধানের পথ ধরে চিটাগংকেও হতে হবে চট্টগ্রাম। কারণ, এই নামের সঙ্গে কত কিংবদন্তি, কত গাঁথা– লোককথা–উপকথা মিশে আছে

বিশ্বখ্যাত ইতিহাস ও ভূগোলবিদ ব্যারনুলি তাঁর ডেসক্রিপশন হিস্টোরিক এট জিয়োগ্রাফিক ডি লিন্ডে (১৭৮৬) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ‘শাট’ মানে বদ্বীপ এবং গঙ্গা, এই দুয়ের সংযুক্তির ফলে এই জায়গার নামকরণ হয়েছে শাটগঙ্গা, যার মানে গঙ্গার সম্মুখে গড়ে ওঠা নগরী। স্যার উইলিয়াম জোন্স অনুমান করেছেন যে এই জায়গায় একটি অনন্যসুন্দর পাখি দেখা যেত; একটি দুটি নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা যেত। পাখিটির নাম ‘ছাতগ’। সেই থেকে বোধ করি চাটিগাঁ। সংস্কৃত পণ্ডিতেরা আবার অন্য ভাষ্য দিয়েছেন, বলেছেন চতুগ্রাম থেকে কালিকপ্রবাহ ও বিবর্তনে এর নাম হয়েছে চট্টগ্রাম। তবে তার সবিস্তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলের নামের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, জনশ্রুতি, নানা কথা, উপকথা ও কিংবদন্তি। সেন্ট পিটার্সবুর্গকে কমিউনিস্ট রাশিয়া নতুন নাম দিলেন লেনিনগ্রাদ। যেই বয়ে গেল পরিবর্তনের হাওয়া সেন্ট পিটার্সবুর্গবাসীরা আদি নামটি ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি তুলল। লেনিনগ্রাদ মুছে সেই প্রাচীন নগর আবার হয়ে গেল সেন্ট পিটার্সবুর্গ। কারণ, এই নামের পেছনে আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস, আছে তার নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি, আছে ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্তি।
চিটাগং গ্যাজেটিয়ারে লেখক এ-ও উল্লেখ করেছেন যে ইংরেজ শাসকদের অনেক বদভ্যাসের মধ্যে একটি ছিল ‘ভালগারাইজেশন অব নেমস’ নামের বিকৃতি করা। এটা যে আমরা উপলব্ধি করিনি, তা কিন্তু নয়। ঢাকা এখন সারা পৃথিবীতে ঢাকা নামে পরিচিত, ড্যাক্কা (DACCA) নয়। বার্মা হয়ে গেছে মিয়ানমার, পিকিং বেইজিং, রেঙ্গুন ইয়াঙ্গুন, বম্বে মুম্বাই, ক্যালকাটা কলকাতা, তাহলে চিটাগং কেন চট্টগ্রাম নয়। একদিন আত্ম-অনুসন্ধানের পথ ধরে চিটাগংকেও হতে হবে চট্টগ্রাম। কারণ, এই নামের সঙ্গে কত কিংবদন্তি, কত গাঁথা–লোককথা–উপকথা মিশে আছে, কত সুখ-দুঃখের, যুদ্ধ-বিগ্রহের, বীরত্ব ও রক্তক্ষয়ের, ঝড়-তুফান ও প্লাবনের স্মৃতি আছে জড়িয়ে।
সুফি সাধকের পীর আউলিয়ার এই পুণ্যভূমির নাম চট্টগ্রামই থাকুক, এ দেশে যেমন, ভিনদেশের মানুষও ডাকুক এই নামে। তাঁরা জানুক এই প্রাচীনতম বন্দরনগর, যা ইবনে বাতুতাকে মুগ্ধ করেছিল ১৩৫০ সালে, যা আইন-ই-আকবরিতে উল্লিখিত আছে সমুদ্রপাশে সুন্দরতম নগরী বলে তার নাম চট্টগ্রাম। কেন অহেতুক চিটাগং হবে। সেই কবে আমাদের রক্ত-মাংস চিবিয়ে আমাদের ঝাঁঝরা করে দিয়ে
সব লুটেপুটে চলে গেছে ইংরেজ আর আমরা এখনো সেই নাম বহন করে চলেছি। এটা ভীষণ লজ্জার। ’৪৭-এ ভারত-পাকিস্তান, ’৭১-এ বাংলাদেশ, তবু ঔপনিবেশিক ভূতকে তাড়ানো গেল না। আসুন, সবাই মিলে আওয়াজ তুলি, চিটাগং নয়, এই সুন্দরতম অঞ্চলের নাম ‘চট্টগ্রাম’, বিশ্বের সবাই যেন সেই নামে চেনে, সেই নামে ডাকে...।
শান্তনু বিশ্বাস: সংগীত শিল্পী, সংস্কৃতি কর্মী।
>>>প্রথম আলো
Videos

Recent Post